ছবির গল্প

গতকাল গেলাম দুবনার এক ফটোগ্রাফারের সোলো ফটো এক্সিবিশনে। আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ, অ্যামেরিকাসহ বিশ্বের আনাচে কানাচে তাঁর ভ্রমণ কাহিনী। এমনিতে খুব ভালো ছবি তোলেন। সব চেয়ে বড় কথা যেখানে অন্যেরা কিছু দেখতে পায়না, তিনি সেখানেও কিছু খুঁজে পান। পরে বন্ধুদের সাথে দেখা হলে জিজ্ঞেস করল প্রদর্শনী সম্পর্কে।

একক প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল ছবি বাছাই করা। অন্যের ছবি যত সহজে রিজেক্ট করা যায়, নিজের ছবি তত সহজে করা যায় না। আসলে প্রতিটি ছবির পেছনেই থাকে কিছু কথা, কিছু গল্প, কিছু অনুভূতি, কিছু স্মৃতি। অন্যের ছবি দেখতে গিয়ে আমরা শুধু ছবিটাই দেখি। যদি ছবিটা কোন পরিচিত মানুষের বা পরিচিত জায়গার হয়, তবে কিছু স্মৃতি হয়তো মনের কোনে ভিড় করে। সেটা না হলে শুধু ছবিই দেখা হয় এবং আবেগ বাদ দিয়ে শুধু ছবির নিয়ম কানুনের ভিত্তিতেই বাছাই করা হয়। নিজের ছবির কথা আলাদা। তখন আবেগ কাজ করে, ছবিরা কথা বলে। ছবি বাছাই করতে গিয়ে কানে শুনি বাতাসের শব্দ, পাখির ডাক, ভেসে ওঠে সাথে থাকা মানুষজনের চেহারা। ফলে কোনটা রাখব, কোনটা বাদ দেব তা নিয়ে এক মহা দ্বন্দ্ব শুরু হয় মনের ভেতর। ফটোগ্রাফিতে একটা কথা চালু আছে, ছবি থেকে সব অপ্রয়োজনীয় বস্তু ছেঁটে ফেলা। ছবির বাছাইতেও তাই। কিন্তু আবেগের কারণে অনেক সময়ই সেটা হয়ে ওঠেনা, ফলে প্রায় একই রকমের ছবি একের পর এক উঠে আসে। কালেক্টিভ এক্সিবিশনে, যেখানে খুব অল্প সংখ্যক ছবি দিতে হয়, সেখানে এ সমস্যা কম, কেননা সবাই চায় নিজের যাকে বলে বেস্ট অফ দ্য বেস্ট ছবিগুলো দেখাতে। অন্যদের ছবির সাথে তুলনার ব্যাপারও মাথায় থাকে, তাই এক ধরণের প্রতিযোগিতা থাকে মনের কোণে। কিন্তু একক প্রদর্শনীতে যেখানে ১০০ থেকে ২০০ ছবিকে দেওয়ালে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়, যেখানে প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকে না, ফলে বাছাইএর কাজটা আরও কঠিন। কেননা, ভালো ছবি যেমন বিভিন্ন বস্তুকে একটা ফ্রেমে ধরে একটা গল্প তৈরি করে, ভালো প্রদর্শনীও তেমনি অনেক ছবিকে একটি হলে একত্রিত করে একটি গল্পে রূপান্তরিত করতে বাধ্য। তা না হলে এমন কি অনেক ভালো ছবি থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি ছবিই হয় একেকটা অক্ষর, কখনও কখনও তারা শব্দ তৈরি করলেও বাক্যে পরিণত হয় না, আবার বাক্য হলেও সেটা ঠিক একটা পুরোপুরি গল্প হয়ে ওঠে না। অনেক সময়ই একক প্রদর্শনী হয় অনেক ভালো ছবির কালেকশন, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তা একটা পূর্ণ গল্প তৈরি করতে পারে।

দুবনা, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯ 
 
 
 

Comments