মস্কোয় বাংলা নববর্ষ
দীর্ঘ ছয় বছর বিরতির পর গতকাল (২৬ এপ্রিল ২০২৬) আমরা বাংলা নববর্ষ উদযাপন করলাম মস্কোর মাটিতে। যদিও বাংলাদেশ দূতাবাস বা প্যাট্রিস লুমুম্বার ছাত্র সংগঠন নববর্ষ পালন করেছে তারপরও আমাদের অনুষ্ঠান মস্কোর বাঙালি কমিউনিটির জন্য ভিন্ন গুরুত্ব বহন করে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়া গঠনের পর থেকে এই সংগঠনের ব্যানারে নববর্ষ পালন করত মস্কোর বাঙালি সমাজ। তবে করোনা মহামারী ও সংগঠকদের বেশিরভাগ রাশিয়া থেকে চলে যাওয়ার কারণে এর কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হবার পথে। তাই বছরের শুরুতে নবাগত ছাত্রদের সাংগঠনিক তৎপরতা দেখে নববর্ষ পালনের পরিকল্পনা করতে শুরু করি।
কোন অনুষ্ঠান মানেই একদল ছেলেমেয়ে যারা আত্মনিবেদিত হয়ে বিভিন্ন কাজকর্ম করবে। এটা যেমন পর্যাপ্ত সময় দেয়া তেমনি কায়িকশ্রম। এরপরে দরকার কোন কালচারাল সেন্টারের যেখানে পর্যাপ্ত সীট থাকবে ও যাতায়াত সুবিধা থাকবে। আর দরকার ডোনেশন। কারণ আজকালকার কোন অনুষ্ঠান মানেই হল বা কমিউনিটি সেন্টারের ভাড়া বাদেই কম করে হলেও দেড় দুই লাখ রুবলের মামলা।
বাঙালির নববর্ষের অনুষ্ঠান মানেই সারা দিনের ব্যাপার। অন্ততঃ এর আগে আমরা সেমাই করতাম। সকাল থেকে সাজানো। স্টল দেয়া। অনুষ্ঠানের শেষে খাওয়া-দাওয়া আর এর পরে আরও ঘন্টা খানেক আড্ডা। তাই মস্কোর টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি হল দেবার পরে যখন জানাল আমাদের সময় মাত্র দুই ঘন্টা - ১৮.০০ থেকে ২০.০০ পর্যন্ত তখন প্রমাদ গুনলাম। এছাড়া বলেছে সিকিউরিটির কারণে আগে থেকেই গেস্ট লিস্ট দিতে হবে আর সবাইকে ঢোকাবে পাসপোর্ট দেখে দেখে।
ফলে শেষের দিকে যারা আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তাদের অনুৎসাহিত করেছি।
লোকেশন একটু অড (মেট্রো থেকে মাত্র ৫ মিনিটের রাস্তা হলেও কনস্ট্রাকশন কাজের জন্য ঘুরে যেতে হয়) থাকায় অনেকেরই জায়গা খুঁজে পেতে সমস্যা হয়েছে। তার উপর বৃষ্টি। যেহেতু বাঙালি দেরি করে আসাটাই নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে তাই আমন্ত্রণ পত্রে ১৭.০০ লেখা হয়েছিল। বৃষ্টির জন্য কিনা বা পরে গেলে ঢুকতে সমস্যা হতে পারে ভেবে অথবা দীর্ঘ সময় কোন অনুষ্ঠান হয়নি বলে লোকজন পাঁচটায় জড় হতে শুরু করে। কিন্তু হলে অন্য প্রোগ্রাম চলায় সবাইকে বাইরে অপেক্ষা করতে হয়।
কথামত ১৮.০০ হল আমাদের দখলে আসে। ভলেন্টিয়ারদের হাতে হল দ্রুত নববর্ষের সাজে সেজে ওঠে। প্রায় দুই শত লোকের অনেকেই দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়। মস্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।
সময়ের স্বল্পতার জন্য আমরা বক্তৃতা পর্ব বলতে গেলে বাদ দেই। পয়লা বৈশাখ উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে আমার স্বাগত বক্তব্য আর মাননীয় রাষ্ট্রদূতের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। এরপর এসো হে বৈশাখ, কবিতা আবৃত্তি, নাচ, একক গান ও শেষে ফ্যাশন শো।
এর আগে নববর্ষের অনুষ্ঠানের জন্য আমরা দীর্ঘদিন রিহার্সাল দিতাম হল ভাড়া করে। সেটাও ছিল বাঙালি আড্ডার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এবার অনুষ্ঠান নিয়ে দোদুল্যমানতা থাকায় রিহার্সাল শুরু হয় পরে - বিভিন্ন বাসায়। এটাও নতুন অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে এই অনুষ্ঠান এক ধরণের লিটমাস টেস্ট। ব্যক্তিগত ভাবে আমি খুবই পজিটিভ। অনেক ত্রুটি বিচ্যুতির পরেও সাধারণ মানুষ সার্বিক ভাবে অনুষ্ঠান উপভোগ করেছে, অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে ভবিষ্যতে আমরা এ ধরণের অনুষ্ঠান আরও করব। আগে বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়া ছিল মূলতঃ মস্কোয় বসবাসকারী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী মানুষের সংগঠন। এদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সংগঠনের টিকে থাকার একমাত্র উপায় হবে ছাত্রদের এগিয়ে আসা। তবে বাংলাদেশ প্রবাসী পরিষদ রাশিয়া নতুন করে পথচলা শুরু করবে কিনা সেটা নির্ভর করবে সবার উপরে। কারণ সংগঠন মানে শুধু কাজ নয়, মানে ক্ষমতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ফলে সংগঠন শুধু সংগঠিত করে না, বিভাজনের জন্ম দেয়।
দেশে সার্বিক সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে পয়লা বৈশাখে বা অন্য কোন উপলক্ষ্যে তাই যেকোনো ছোটখাটো আয়োজন - এটাও ছোট কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ। আশা করি সবাই নিজের নিজের জায়গা থেকে এটা উপলব্ধি করবে। আমরা আমাদের বাংলা সংস্কৃতির চর্চা আগামীতে চালিয়ে যেতে পারব।
যারা উপস্থিত থেকে, আর্থিক সাহায্য ও পরামর্শ দিয়ে অনুষ্ঠান সফল করার জন্য সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। সামনেও পাশে থাকবেন সে আশা রইল।
মস্কো, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
Comments
Post a Comment